এসএসসিতে ছেলের সঙ্গে জিপিএ-৫ পেলেন মা….see more

ছেলের সঙ্গে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলেন মা। দুজনের প্রস্তুতিও চলে পাশাপাশি। ছেলে পড়েছে। মা-ও পড়েছেন। সংসারের দায়িত্ব সামলে বই-খাতা নিয়ে রাত জেগেছেন তিনি। অবশেষে ফল প্রকাশের দিন এলো সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। মা পেয়েছেন জিপিএ-৫। ছেলে পেয়েছে গোল্ডেন জিপিএ-৫।

সোমবার (১০ আগস্ট) বিকেলে রাজশাহী নগরের রাজপাড়া থানার বসিলা এলাকায় তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ফল প্রকাশের পর স্বজন ও পরিচিতজনেরা তাদের অভিনন্দন জানাচ্ছেন

পরিবার সূত্রে জানা যায়, সাদিয়া বেগমের স্বামী তোফাজ্জল হোসেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। স্বামী-সংসার, সন্তান লালন-পালনসহ নানা দায়িত্বের মধ্যেও নিজের পড়াশোনার স্বপ্নকে হারিয়ে যেতে দেননি সাদিয়া। একসময় যে পড়াশোনা বিয়ের পর থেমে গিয়েছিল, দীর্ঘ বিরতির পর সেটিই আবার শুরু করেন তিনি। বয়সের ব্যবধান তাকে থামাতে পারেনি। সংসারের ব্যস্ততাও পারেনি। ছেলের পড়াশোনার খোঁজ নেওয়ার পাশাপাশি নিজের বইও খুলেছেন। ছেলে যখন পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে, তিনিও নিয়েছেন নিজের প্রস্তুতি। একই বছরে একই পরীক্ষায় বসেছেন মা ও ছেলে।

১৯ বছর আগে বিয়ের পর থেমে গিয়েছিল সাদিয়া বেগমের পড়াশোনা। সংসার ও পারিবারিক দায়িত্বের কারণে বই-খাতা ছেড়ে দিতে হয়েছিল। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর পড়াশোনার বাইরে ছিলেন তিনি। তবে পড়াশোনার প্রতি টানটা রয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আবার বই হাতে নেন সাদিয়া। নতুন করে শুরু করেন শিক্ষাজীবন। সংসার সামলেছেন। সন্তানদের বড় করেছেন। দুই ছেলের পড়াশোনার খোঁজ রেখেছেন। এর পাশাপাশি চালিয়ে গেছেন নিজের পড়াশোনা। প্রায় দুই বছর আগে নেন আরও বড় সিদ্ধান্ত। ছেলের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা দেবেন তিনি। পরিবারের সম্মতিতে শুরু হয় প্রস্তুতি। সংসারের কাজের ফাঁকে পড়াশোনা করেছেন। সন্তানের পড়াশোনার দেখভালের পাশাপাশি নিজের পড়াশোনার সময়ও বের করেছেন।

চলতি বছরের এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সেই পরিশ্রমের ফল পেয়েছেন সাদিয়া বেগম। তিনি জিপিএ-৫ পেয়েছেন। রাজপাড়া আদর্শ মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। একই সময়ে তাঁর ছেলে তানভীর আহমেদও এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষায় অংশ নেয় সে। তানভীর পেয়েছে গোল্ডেন জিপিএ-৫। অর্থাৎ, একই বছরে একই সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে মা ও ছেলে দুজনেই পেয়েছেন জিপিএ-৫।

নিজের সাফল্যের অনুভূতি জানাতে গিয়ে সাদিয়া বেগম বলেন, ‘পড়াশোনার প্রতি ঝোঁক ছিল। কিন্তু বিয়ের পর নানা কারণে পড়ালেখা করতে পারিনি। কিন্তু হাল ছাড়িনি।’

তিনি বলেন, ‘বছর দুয়েক আগে সিদ্ধান্ত নিলাম; ছেলের সঙ্গে পরীক্ষা দেব। পরিবারের সম্মতিতে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। সেই সিদ্ধান্ত থেকেই চলতি বছর ছেলে আর আমি এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিই।’

নিজের সাফল্যের পাশাপাশি ছেলের ফলাফল নিয়ে সাদিয়া বললেন, ‘সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হলো সংসার সামলিয়ে ও দুই ছেলের পড়ালেখার খোঁজখবর রাখার পাশাপাশি নিজে পড়ালেখা করে জিপিএ-৫ পেয়েছি। সঙ্গে ছেলের গোল্ডেন জিপিএ-৫। মা-ছেলের এমন সাফল্যে আমার পুরো পরিবার আনন্দিত।’

মায়ের সঙ্গে একই পরীক্ষায় অংশ নেওয়া তানভীর আহমেদের কাছে বিষয়টি ছিল অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা। তানভীর বলেন, আমার মায়ের সঙ্গে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দুজনই জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছি। মায়ের সঙ্গে পরীক্ষা দেওয়ার সৌভাগ্য কজনের হয়। আমি সেই সৌভাগ্যবান।’

মায়ের পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের পড়াশোনার কথা তুলে ধরে তানভীর বললেন, ‘মা সার্বক্ষণিক আমার পড়ালেখার খোঁজখবর রাখতেন। সঙ্গে নিজেও পড়তেন। রাত জেগে আমার পাশে বসে থাকতেন। আমি পড়ালেখা করতাম।’

নিজের এই সাফল্য বাবা-মাকে উৎসর্গ করে তানভীর বলেন, ‘আমার এই কৃতিত্ব আমার বাবা-মাকে উৎসর্গ করছি। বড় হয়ে আমি একজন ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখছি। এজন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই।’

মা-ছেলের এই সাফল্যে আনন্দিত তাদের গৃহশিক্ষক আরিফুল ইসলাম। দীর্ঘদিন ধরে কাছ থেকে তাদের পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। গৃহশিক্ষক বলেন, আমি চার বছর ধরে তানভীরকে ইংরেজি পড়াই। সঙ্গে তার মাকেও সহযোগিতা করছিলাম। দুজনের এমন সাফল্যে আমি অনেক খুশি। এমন ঘটনার সাক্ষী হতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি।’

সাদিয়া বেগম ও তানভীর আহমেদের এই সাফল্য শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়। এটি একটি অসম্পূর্ণ স্বপ্ন পূরণের গল্প। এটি একজন মায়ের নতুন করে শুরু করার গল্প। এটি মা-ছেলের পাশাপাশি এগিয়ে চলার গল্প। জীবনের ব্যস্ততা মানুষকে অনেক দূরে সরিয়ে নিতে পারে। সংসারের দায়িত্বও থামিয়ে দিতে পারে পড়াশোনা। কিন্তু ইচ্ছা থাকলে সেই পথ আবার খুঁজে নেওয়া যায়। সাদিয়া বেগম সেই পথই খুঁজে নিয়েছেন। আর সেই পথের সঙ্গী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *