সোনালী ব্যাংকের ওই ক্যাশ অফিসারের চোখের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না! একটা ভুলের জন্য একজন মানুষকে এভাবে হেনস্তা করা যায় ভাবতেই খারাপ লাগছে।
ঘটনাটা হলো, গতকাল গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার সোনালী ব্যাংক শাখায় এক গ্রাহক ৫ লাখ টাকা জমা দিতে যান। টাকা গোনার পর ক্যাশ অফিসার ফৈজিয়া হক জানান, সেখানে ৪ হাজার ৫০০ টাকা কম আছে।
গ্রাহক বিষয়টি নিয়ে আপত্তি করলে সিসিটিভি ফুটেজ দেখা হয়। পরে দেখা যায়, টাকাগুলো আসলে ওই কর্মকর্তার কাউন্টারেই পড়ে ছিল। অর্থাৎ টাকা কম যায়নি, কর্মকর্তার হিসাবেই ভুল হয়েছিল। তিনি নিজের ভুল স্বীকারও করেন এবং টাকা গ্রাহককে বুঝিয়ে দেন।
ব্যাংকে তখন প্রচণ্ড ভিড় ছিল, তার ওপর হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় অসাবধানতাবশত এই ভুল হয়েছে এমনটাই তিনি জানান।
এখানেই তো ঘটনা শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু এরপর শুরু হয় আরেক নাটক।
কয়েকজন মোবাইল সাংবাদিক তাকে এমনভাবে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে থাকেন, যেন ইতোমধ্যেই প্রমাণ হয়ে গেছে তিনি ইচ্ছা করেই টাকা আত্মসাতের চেষ্টা করেছেন! ভিডিও করা হয়েছে, নানা ক্যাপশন দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে। ম্যানেজার বারবার অনুরোধ করার পরও থামেনি সেই জেরা।
একপর্যায়ে ওই নারী কর্মকর্তাকে কাঁদতে দেখা যায়।
একটু ভাবুন তো ভুল করা আর প্রতারণা করা কি একই জিনিস?
মানুষ ভুল করতেই পারে। একজন ব্যাংক কর্মকর্তা যতই দায়িত্বশীল হোন, তিনিও তো মানুষ। ভুল হওয়ার পর সেটা যাচাই হলো, সিসিটিভিতে সত্যিটা বেরিয়ে এলো, তিনি নিজের ভুল মেনে নিলেন এবং টাকাও ফেরত দিলেন। তাহলে এরপরও একজন মানুষকে প্রকাশ্যে অপমান করার প্রয়োজনটা কোথায়?
আমার নিজের সাথেও কিছুদিন আগে প্রিমিয়ার ব্যাংকে প্রায় একই ধরনের একটা ঘটনা ঘটেছিল। প্রথমে মনে হয়েছিল ব্যাংক কর্মকর্তার ভুল, পরে যাচাই করে দেখা গেল সেটাও কর্মকর্তার অনিচ্ছাকৃত ভুল।
তাই কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপরাধী বানিয়ে ফেলার এই প্রবণতা আমাদের থামানো দরকার।
মাত্র ৫০০ টাকার ৯টি নোটের হিসাবের ভুল সেটা নিয়ে একজন মানুষকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে দেওয়া কোনোভাবেই সাংবাদিকতা হতে পারে না।
কারও ভুলের বিচার করার আগে একবার তার জায়গায় নিজেকে দাঁড় করিয়ে দেখুন।
একজন মানুষ কত পরিশ্রম করে একটা চাকরিতে পৌঁছেছেন, কত দায়িত্ব নিয়ে প্রতিদিন কাজ করছেন একটা ভুলের মুহূর্তে সেই পুরো মানুষটাকেই আমরা যেন মুছে না দিই।
আজকাল কিছু একটা ঘটলেই ভিডিও হাতে নিয়ে ‘বড় সাংবাদিকতা’ করার যে অভ্যাস তৈরি হয়েছে, সেটারও একটা সীমা থাকা দরকার।
ভুল ধরিয়ে দেওয়া সাংবাদিকতার কাজ হতে পারে, কিন্তু একজন মানুষকে অকারণে অপমানিত করে দেওয়া সাংবাদিকতা নয়