ভাবুন তো, ১২ বছর ধরে মেয়েটার মাথাটা ৯০ ডিগ্রি বেঁকে ছিল! মানে পুরো পৃথিবী সে ৯০ ডিগ্রি বাকানো দেখতো!!
পাকিস্তানের আফশিন গুল।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় আফশিন গুল ‘অ্যাটল্যান্টো-অ্যাক্সিয়াল রোটেটরি ডিসলোকেশন’ নামক একটি বিরল ও জটিল সমস্যায় ভুগছিলেন। এটি মূলত ঘাড়ের মেরুদণ্ডের প্রথম দুটি কশেরুকার C1 এবং C2 স্থানচ্যুতি।
১০ মাস বয়সে বোনের কোল থেকে পড়ে যাওয়ার কারণে এই অভ্যন্তরীণ চোট লাগে, যা চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় দীর্ঘ ১২ বছর থাকায় তার ঘাড় স্থায়ীভাবে ৯০ ডিগ্রি কোণে বেঁকে যায়। এর পাশাপাশি তার সেরিব্রাল পালসিও ছিল, যা তার শারীরিক বিকাশকে আরও ধীর করে দিয়েছিল।
পাকিস্তানের কোনো হাসপাতালে এই ধরনের জটিল পেডিয়াট্রিক স্পাইনাল সার্জারির জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি ও পরিকাঠামো ছিল না। সেখানের চিকিৎসকেরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, এই অস্ত্রোপচারে আফশিনের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা মাত্র ৫০%। কারণ, মাথার খুলি ও ঘাড়ের সংযোগস্থলে থাকা অতি সংবেদনশীল স্নায়ু বা রক্তনালীতে সামান্যতম আঘাত লাগলে তাৎক্ষণিকভাবে তার ফুসফুস ও হার্ট কাজ করা বন্ধ করে দিতে পারত, যার ফলে মৃ-* বা চিরতরে প্যারালাইজড হতে পারতো।
২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে BBC-তে আফশিনের দুর্দশার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর, ২০১৯ সালে ব্রিটিশ সাংবাদিক আলেকজান্দ্রিয়া টমাস এই পরিবারটিকে দিল্লির ইন্দ্রপ্রস্থ অ্যাপোলো হাসপাতালের প্রখ্যাত স্পাইনাল সার্জন ডা. রাজাগোপালন কৃষ্ণন-এর সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেন। আফশিনের অবস্থা দেখে ডা. কৃষ্ণন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই জটিল চিকিৎসা করার সিদ্ধান্ত নেন।
ভারত- পাকিস্তান এই দুই দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পেরিয়ে অবশেষে ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে আফশিন ও তার পরিবার ভারতে আসে। মূল অস্ত্রোপচারের আগে তার শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কিছু প্রাথমিক চিকিৎসা করা হয়।
অবশেষে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মূল ৬ ঘণ্টার একটি ম্যারাথন অস্ত্রোপচার করা হয়। ডা. কৃষ্ণন এবং তার বিশেষজ্ঞ দল টাইটানিয়ামের বিশেষ রড এবং স্ক্রুর সাহায্যে আফশিনের মাথার খু/ লিকে তার ঘাড়ের মেরুদণ্ডের সাথে নিখুঁতভাবে সোজা করে যুক্ত করে দেন।
অস্ত্রোপচারের মাত্র ৪ মাসের মাথায় আফশিনের জীবনে অবিশ্বাস্য পরিবর্তন আসে। সে প্রথমবারের মতো নিজের ঘাড় সোজা করে তাকাতে সক্ষম হয় এবং নিজে নিজে হাঁটা, কথা বলা ও খাবার খাওয়া শুরু করে।
সুস্থ হয়ে পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার পরও ডা. কৃষ্ণন নিয়মিত স্কাইপ-এর মাধ্যমে আফশিনের স্বাস্থ্যের খোঁজখবর রাখতেন। বর্তমানে সে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে তার স্বাভাবিক জীবন উপভোগ করছে…
সে এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় সুন্দর সুন্দর জামাকাপড় পরে সাজগোজ করে কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে দারুণ পপুলার!
তার ইন্সট্রাগ্রামে ফলোয়ারের সংখ্যা প্রায় 329K….
যাইহোক একজন ডাক্তার জাস্ট মানবিকতার খাতিরে একটা বাচ্চার জীবন বাঁচিয়ে দিলেন। স্যালুট আফশিনের এই দীর্ঘ লড়াইকে, আর শ্রদ্ধা ডা. রাজাগোপালন কৃষ্ণনের মতো রিয়েল লাইফ হিরোদের!