ছয় ছেলের পাকা বাড়ি, তবুও মায়ের ঠাঁই হলো না! দরজায় দরজায় ঘুরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন ৮৫ বছরের বৃদ্ধা
যে মাকে ঘিরে একসময় ছিল সন্তানের হাসি-আনন্দ, সেই মায়েরই বৃদ্ধ বয়সে আশ্রয়ের জন্য ছেলেদের দরজায় বসে থাকতে হলো! চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে ৮৫ বছর বয়সী জয়নব ভানুর এমন অসহায়ত্বের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। ছয় ছেলের সবার পাকা বাড়ি থাকলেও মায়ের জন্য কারও ঘরে জায়গা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরে আশ্রয় না পেয়ে ছেলেদের ঘরের সামনে বসে থাকতে হয়েছিল জয়নব ভানুকে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হওয়ার পর মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) তাঁর বাড়িতে যান শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিরা খাতুন।
প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা শেষে পারিবারিক সমঝোতার মাধ্যমে বৃদ্ধাকে তাঁর সৌদি প্রবাসী সেজো ছেলে আনোয়ার হোসেনের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। এর আগে ছেলেদের বাড়িতে আশ্রয় না পেয়ে মেয়ে ঝর্ণা বেগমের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন তিনি।
ইউএনও মনিরা খাতুন বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। ছয় ছেলের প্রত্যেকের পাকা বাড়ি থাকলেও মায়ের জন্য আলাদা একটি কক্ষের ব্যবস্থা না থাকা হতাশাজনক। আপাতত তাঁকে সেজো ছেলের বাড়িতে রাখা হয়েছে। সেখানে তাঁর যথাযথ দেখভাল হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে। দুই মাস পর তিনি আবারও গিয়ে খোঁজ নেবেন। পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও বিষয়টি নিয়মিত নজরদারিতে রাখতে বলা হবে।
জানা গেছে, মৃত সৈয়দ আহমেদের স্ত্রী জয়নব ভানুর মোট ১০ সন্তান—ছয় ছেলে ও চার মেয়ে। সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে ছেলেরা তাঁকে নিজেদের বাড়িতে রাখতে রাজি হননি বলে অভিযোগ রয়েছে। স্বামীকে বহু বছর আগে হারানো এই বৃদ্ধা শেষ পর্যন্ত স্বামীর ভিটায় একটি ছোট কুঁড়েঘর নির্মাণ করে দেওয়ার আকুতিও জানিয়েছিলেন।
জয়নব ভানুর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় এক মাস কুমিল্লায় চিকিৎসাধীন থাকার পর বাড়িতে ফিরে তিনি ছেলেদের কারও ঘরে প্রবেশ করতে পারেননি। দীর্ঘ সময় দরজায় ডাকাডাকি করেও সাড়া না পেয়ে বাড়ির সামনে বসে পড়েন। একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। পরে স্থানীয় কয়েকজন যুবক তাঁকে দেখতে পেয়ে খোঁজখবর নেন।
তবে পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে ভিন্ন চিত্রও উঠে এসেছে। মেজো ছেলে আবুল কাশেম দাবি করেন, তাঁর মা প্রায় এক বছর কোথায় ছিলেন, তা তিনি জানেন না। তিনি কয়েকবার মাকে ডেকেছেন বলেও জানান। বড় ছেলে শাহজাহানের স্ত্রী বলেন, জয়নব ভানু তাঁদের দরজার সামনে কয়েক মিনিট বসেছিলেন। এরপর কী হয়েছে, তা তাঁর জানা নেই। সেজো ছেলে আনোয়ার হোসেনের স্ত্রীও জানান, জয়নব ভানু কখন বাড়িতে এসেছেন, সে বিষয়ে তাঁরা অবগত ছিলেন না।
অন্যদিকে, মেয়ে ঝর্ণা বেগমের অভিযোগ, গত ২০ বছর ধরে তাঁর মায়ের সঙ্গে এমন আচরণ করা হচ্ছে। মায়ের অসহায়ত্বের খবর পেয়ে তিনি ছুটে গিয়ে তাঁকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেন। তাঁর দাবি, ভাইয়েরা চান তাঁদের মাকে যেন তাঁর বাড়িতেই রাখা হয়।
জয়নব ভানুর ছয় ছেলের মধ্যে দুজন—শাহজাহান ও আবুল কাশেম—দেশে থাকেন। অন্য চার ছেলে প্রবাসে রয়েছেন। চিতোষী পূর্ব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলম বেলাল জানান, ঘটনাটি আগে তাঁর জানা ছিল না। তবে বার্ধক্যে একজন মায়ের এমন দুর্ভোগের শিকার হওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের হস্তক্ষেপে আপাতত একটি আশ্রয়ের ব্যবস্থা হয়েছে জয়নব ভানুর। তবে শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বৃদ্ধ বয়সে তাঁর প্রয়োজন নিয়মিত যত্ন, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও মানসিক শান্তি।
একজন মা তাঁর সন্তানদের বড় করতে জীবনের কতটা সময় ও শ্রম ব্যয় করেন, তা হয়তো সন্তানরা বড় হওয়ার পর অনেক সময় ভুলে যান। জয়নব ভানুর ঘটনা আবারও সামনে এনেছে বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব ও পারিবারিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো, নতুন আশ্রয়ে তিনি যেন সম্মান ও যত্ন নিয়ে বাকি জীবন কাটাতে পারেন।